মাসি পিসি গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
প্রিয় শিক্ষার্থীবৃন্দ, উচ্চ মাধ্যমিক বাংলা সাহিত্যের এবং সিলেবাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এবং মননশীল গল্প হলো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের রচিত ‘মাসি-পিসি’। এই গল্পটি নারী জীবনের সংগ্রাম, দুর্বল ও অসহায়দের প্রতি শোষণ এবং সর্বোপরি নারী-সংহতির এক অসামান্য দলিল। এই গল্পটি HSC পরীক্ষার বাংলা প্রথম পত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিচের ৫টি সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর বোর্ড পরীক্ষার মানদণ্ড অনুযায়ী তৈরি করা হয়েছে। এইগুলো অনুশীলন করলে তোমরা গল্পের গভীরতা এবং প্রশ্নের ধরন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাবে।
নিচে ‘মাসি-পিসি’ গল্পের ৫টি সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর দেওয়া হলো।
প্রশ্ন-১: নারী-সংহতি ও প্রতিরোধের প্রতীক
উদ্দীপক:
খবরের কাগজে প্রকাশিত হলো, বৃদ্ধা জয়গুন বিবি (৭০) তাঁর পালিত নাতনি সখিনাকে (১৬) স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের হাত থেকে রক্ষা করতে প্রাণপণে লড়েছেন। সখিনার বিধবা হওয়ার সুযোগ নিয়ে কিছু দুর্বৃত্ত তাকে অবৈধ কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। জয়গুন বিবি, একা হওয়া সত্ত্বেও, লাঠি হাতে তাঁদের মোকাবিলা করেন এবং প্রতিবেশী নারীদেরও একত্রিত করে দুর্বৃত্তদের গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেন।
- আরো পড়ুন: অপরিচিতা গল্পের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর
(ক) জ্ঞানমূলক: আহ্লাদির স্বামীর নাম কী?
(খ) অনুধাবনমূলক: মাসি-পিসি কেন আহ্লাদিকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে রাজি হননি?
(গ) প্রয়োগমূলক: উদ্দীপকের জয়গুন বিবির সাথে ‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি ও পিসির চারিত্রিক সাদৃশ্য ব্যাখ্যা করো।
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক: “জয়গুন বিবির একক প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত নারী-সংহতিতে পরিণত হয়েছে” ‘মাসি-পিসি’ গল্পের আলোকে উক্তিটির যথার্থতা মূল্যায়ন করো।
উত্তর-১
(ক) জ্ঞানমূলক:আহ্লাদির স্বামীর নাম জগু।
(খ) অনুধাবনমূলক:মাসি-পিসি আহ্লাদিকে শ্বশুরবাড়ি পাঠাতে রাজি হননি, কারণ তাঁরা জানতেন যে আহ্লাদির শ্বশুরবাড়ির লোকজন তাকে শুধু শোষণ করার উদ্দেশ্যেই নিতে চায়।
বিশেষত, দুর্ভিক্ষের বাজারে আহ্লাদির ভরণপোষণের দায় এড়াতে এবং তার স্বামীকে দিয়ে তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। তাঁর জীবনের নিরাপত্তা ছিল না। মাসি-পিসি নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়েও আহ্লাদিকে তাঁর পিত্রালয়ে আশ্রয় ও সুরক্ষা দিয়েছিলেন, তাই তারা কোনোমতেই তাকে আবার শোষকদের হাতে তুলে দিতে চাননি।
(গ) প্রয়োগমূলক:উদ্দীপকের জয়গুন বিবি এবং ‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি ও পিসির মধ্যে নারী-সংহতি ও প্রতিরক্ষার দিক থেকে চারিত্রিক সাদৃশ্য বিদ্যমান।
মাসি-পিসি দুজনেই দরিদ্র, কিন্তু তাঁদের নীতি ও নৈতিকতা অত্যন্ত দৃঢ়। আহ্লাদি ছিল তাঁদের ভাগ্নি ও ননদের মেয়ে সম্পর্কে দূরত্বের হলেও তাঁরা তাকে নিজেদের মেয়ের মতো ভালোবাসতেন এবং গ্রামের প্রভাবশালী গোমস্তা ও আহ্লাদির স্বামীর শোষণের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বদ্ধপরিকর ছিলেন।
তাঁদের দুর্বল শারীরিক কাঠামোর বিপরীতে ছিল অদম্য মানসিক জোর। ঠিক একইভাবে, উদ্দীপকের বৃদ্ধা জয়গুন বিবিও তাঁর পালিত নাতনিকে বিপদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য লাঠি হাতে দুর্বৃত্তদের প্রতিরোধ করেছেন। উভয় ক্ষেত্রেই নিজেদের জীবনের পরোয়া না করে অসহায় নারীকে আশ্রয় ও নিরাপত্তা প্রদানের মাধ্যমে তাঁরা সমাজের শোষণের বিরুদ্ধে এক বলিষ্ঠ মানবিক প্রাচীর তৈরি করেছেন।
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক:উক্তিটি ‘মাসি-পিসি’ গল্পের আলোকে সম্পূর্ণ যথার্থ।
‘মাসি-পিসি’ গল্পে সমাজের নির্মম শোষণ ও নারীর প্রতি পরাধীনতার চিত্র ফুটে উঠেছে। আহ্লাদির অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে যখন তার স্বামী ও গোমস্তারা তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে, তখন মাসি ও পিসি প্রথমে এককভাবে প্রতিরোধ করেন। তাঁদের হাতে দা-বঁটি দেখে দুর্বৃত্তরা ভয় পেলেও মাসি-পিসির মনের জোরই ছিল আসল শক্তি।
কিন্তু তাদের এই একক প্রতিরোধ শেষ পর্যন্ত গ্রামের অন্য নারীদের জন্যও অনুপ্রেরণা হয়ে ওঠে। নদীর ঘাটে যখন গোমস্তার দল মাসি-পিসিকে ঘিরে ফেলে, তখন অন্য মেয়ে-বউরা এগিয়ে আসে। মাসি-পিসির রুখে দাঁড়ানো দেখে তাদের মধ্যে সাহস সঞ্চারিত হয়। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সমাজে যখন কোনো দুর্বল পক্ষ মাথা তুলে দাঁড়ায়, তখন তা অন্যদের মধ্যেও প্রতিরোধের বার্তা পৌঁছে দেয়। মাসি-পিসি কেবল আহ্লাদিকেই রক্ষা করেননি, বরং নারী-সংহতির এক প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, যা শোষকশ্রেণিকে মোকাবিলা করার সাহস জুগিয়েছিল।
প্রশ্ন-২: শোষণের স্বরূপ
উদ্দীপক:
এক অসচ্ছল পরিবারের মেয়েকে ধনী এক ব্যবসায়ীর সাথে বিয়ে দেওয়া হলো। কিছুদিন পরই জানা গেল, মেয়েটিকে যৌতুকের জন্য নির্যাতন করা হয়। বাবার বাড়ি থেকে টাকা আনতে না পারায় তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় এবং সবশেষে তাকে বিক্রি করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাবার বাড়ির দুজন বিশ্বস্ত লোক গিয়ে মেয়েটিকে উদ্ধার করে আনে।
(ক) জ্ঞানমূলক: ‘মাসি-পিসি’ গল্পের লেখক কে?
(খ) অনুধাবনমূলক: আহ্লাদিকে ফিরিয়ে নিতে গোমস্তার আসার মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?
(গ) প্রয়োগমূলক: উদ্দীপকে বর্ণিত ব্যবসায়ীর কার্যকলাপ ‘মাসি-পিসি’ গল্পের আহ্লাদির শ্বশুরবাড়ির আচরণের সঙ্গে কীভাবে তুলনীয়?
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক: আহ্লাদির ওপর তার স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং গোমস্তার চক্রান্ত এই দুটি বিষয় শোষণের কোন কোন দিককে ফুটিয়ে তুলেছে? বিশ্লেষণ করো।
উত্তর-২
(ক) জ্ঞানমূলক:‘মাসি-পিসি’ গল্পের লেখক হলেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়।
(খ) অনুধাবনমূলক:আহ্লাদিকে ফিরিয়ে নিতে গোমস্তার আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল মাসি-পিসির কাছ থেকে টাকা আদায় করা। দুর্ভিক্ষের কারণে মাসি-পিসির ঘরে আশ্রিত আহ্লাদিকে কাজে লাগিয়ে তার শ্বশুরবাড়ির লোকেরা ফায়দা লুটতে চেয়েছিল। বিশেষত, আহ্লাদি যে সম্পদ বা অর্থের উৎস হতে পারে, এই ধারণা থেকেই তারা গোমস্তাকে পাঠিয়েছিল তাঁদের ভয় দেখিয়ে বা ভয় দেখিয়ে টাকা আদায় করতে। এছাড়া, আহ্লাদির স্বামীর নির্যাতন থেকে বাঁচতে সে বাপের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়ায় তাদের পৌরুষের অহমিকাও ক্ষুণ্ণ হয়েছিল।
(গ) প্রয়োগমূলক:উদ্দীপকে বর্ণিত ব্যবসায়ীর কার্যকলাপ ‘মাসি-পিসি’ গল্পের আহ্লাদির শ্বশুরবাড়ির আচরণের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে তুলনীয়।
উদ্দীপকে ব্যবসায়ী যেমন যৌতুক ও অর্থের জন্য স্ত্রীকে নির্যাতন করেছেন এবং শেষে তাকে বিক্রি করার মতো জঘন্য চেষ্টা করেছেন, তেমনি ‘মাসি-পিসি’ গল্পে আহ্লাদির শ্বশুরবাড়ির লোকেরাও তাকে শোষণের বস্তু হিসেবে দেখেছিল।
আহ্লাদির স্বামী জগু যেমন দুর্ভিক্ষের সময় তাকে নির্যাতন করেছে, তেমনি গোমস্তাকে দিয়ে ভয় দেখিয়ে মাসি-পিসির কাছ থেকে টাকা আদায়ের ফন্দি এঁটেছে। উভয় ক্ষেত্রেই নারীর মানবিক মূল্যকে অস্বীকার করে তাকে কেবল অর্থনৈতিক বা ভোগের সামগ্রী হিসেবে গণ্য করা হয়েছে, যা শোষণের এক নির্মম দিককে প্রকাশ করে।
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক:আহ্লাদির ওপর তার স্বামীর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন এবং গোমস্তার চক্রান্ত—এই দুটি বিষয় যথাক্রমে পারিবারিক ও সামাজিক শোষণের দুটি ভিন্ন দিককে ফুটিয়ে তুলেছে।
আহ্লাদির স্বামী জগুর দ্বারা নির্যাতন হলো পারিবারিক শোষণ ও অত্যাচার। এই শোষণ চলে আবেগের আড়ালে, যেখানে স্বামী নামক সম্পর্কটিই অত্যাচারীর ভূমিকা নেয়। এটি নারীর প্রতি সহিংসতা ও দাসত্বের প্রতীক।
অন্যদিকে, গোমস্তার চক্রান্ত হলো সামাজিক বা কাঠামোগত শোষণ। গোমস্তা প্রভাবশালী জমিদারশ্রেণির প্রতিনিধি, যারা আইন ও শক্তির দোহাই দিয়ে দুর্বলদের ওপর শোষণ চালায়। গোমস্তা যখন আহ্লাদিকে জোর করে নিয়ে যেতে আসে, তখন সে একা আসে না, আসে তার দলবল নিয়ে—যা বৃহত্তর সমাজকাঠামোর শোষণকেই নির্দেশ করে।
সুতরাং, স্বামীর নির্যাতন নারীর ব্যক্তিগত জীবনের দুর্বলতার সুযোগ নেয়, আর গোমস্তার চক্রান্ত গোটা সমাজের দুর্বলের প্রতি সবলের অত্যাচারের প্রতীক। গল্পে লেখক একই সাথে নারী জীবনের ব্যক্তিগত ও সামাজিক দুই প্রকার শোষণের স্বরূপ উন্মোচন করেছেন।
প্রশ্ন-৩: পরিবেশ ও জীবনসংগ্রাম
উদ্দীপক:
চরবাসীদের জীবন খুবই কষ্টের। নদীর ভাঙা-গড়ার খেলায় তাদের ঘর বারবার বিলীন হয়ে যায়। তাদের একমাত্র জীবিকা হলো বর্ষার সময় মাছ ধরা আর শুকনোর সময় চরের জমিতে ফসল ফলানো। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে তারা টিকে থাকে। তাদের এই জীবন যেমন কঠিন, তেমনি বাইরের কোনো বিপদ এলে তারা প্রকৃতির আশ্রয় নিয়েই তা মোকাবিলা করে।
(ক) জ্ঞানমূলক: মাসি-পিসি কী দিয়ে নিজেদের রাতের খাবার রান্না করেন?
(খ) অনুধাবনমূলক: ‘ভাত-কাপড়ের দাবিটুকুও জোরালো নয়’—উক্তিটি দ্বারা কী বোঝানো হয়েছে?
(গ) প্রয়োগমূলক: উদ্দীপকের চরবাসীদের জীবিকার সঙ্গে ‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি ও পিসির জীবনসংগ্রামের মিল দেখাও।
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক: উদ্দীপকের মতো ‘মাসি-পিসি’ গল্পে প্রকৃতির (নদীর) ভূমিকা শুধু জীবিকার উৎসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি—বিশ্লেষণ করো।
উত্তর-৩
(ক) জ্ঞানমূলক:মাসি-পিসি লাউশাক আর ডাঁটা পুঁইশাক দিয়ে নিজেদের রাতের খাবার রান্না করেন।
(খ) অনুধাবনমূলক:‘ভাত-কাপড়ের দাবিটুকুও জোরালো নয়’ উক্তিটি দ্বারা আহ্লাদির চরম অসহায়ত্ব এবং পরাধীনতা বোঝানো হয়েছে। একজন বিবাহিত নারীর তার স্বামীর কাছে অন্তত মৌলিক প্রয়োজন (অন্ন-বস্ত্র) মেটানোর দাবি থাকে। কিন্তু আহ্লাদির স্বামী জগু এতটাই নির্মম ও শোষক ছিল যে, সে আহ্লাদিকে নির্যাতন করত এবং তার এই ন্যূনতম দাবিটুকুও পূরণ করত না। ফলে আহ্লাদির কাছে বেঁচে থাকার সাধারণ অধিকারটুকুই প্রধান হয়ে উঠেছিল, যেখানে ভাত-কাপড়ের অধিকারের দাবিও ক্ষীণ হয়ে গিয়েছিল।
(গ) প্রয়োগমূলক:উদ্দীপকের চরবাসীদের জীবিকার সাথে ‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি ও পিসির জীবনসংগ্রামের গভীর মিল রয়েছে।
চরবাসীরা যেমন নদী বা প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে মাছ ধরে ও চাষ করে জীবন নির্বাহ করে, তেমনি মাসি ও পিসিও মূলত মাছ ধরার (শুকনো বা ভেজা খোকা ইলিশ, পুঁটি মাছ ইত্যাদি) এবং লাউ-কুমড়ো চাষের মাধ্যমে নিজেদের জীবিকা নির্বাহ করেন। উভয়ের জীবনই অত্যন্ত কঠিন, যেখানে প্রকৃতি ও ক্ষুধা এই দুইয়ের সঙ্গে নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয়। এই সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তাঁদের চরিত্রের দৃঢ়তা ও টিকে থাকার মানসিকতা তৈরি হয়েছে।
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক:উক্তিটি যথার্থ। ‘মাসি-পিসি’ গল্পে নদীর ভূমিকা শুধু জীবিকার উৎসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এটি ছিল এক নিরাপত্তার প্রতীক এবং গল্পটির পরিবেশ নির্মাণে মুখ্য উপাদান।
উদ্দীপকে যেমন চরবাসীরা বিপদ মোকাবিলায় প্রকৃতির আশ্রয় নেয়, তেমনি মাসি-পিসিও গোমস্তার আক্রমণ থেকে বাঁচতে তাঁদের ভেড়ার মাচার ওপর আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং নৌকা নিয়ে নদীর দিকে এগিয়েছিলেন। নদী ছিল তাঁদের পরিচিত জগৎ, যার সুবিধা-অসুবিধা তাঁদের জানা ছিল।
এই নদীপথই ছিল গোমস্তার দলের আক্রমণের সময় তাঁদের একমাত্র পালানোর পথ বা নিরাপদ আশ্রয়।
এছাড়া, নদীর ধারের এই পরিবেশ মাসি-পিসির চরিত্রকে এক রুক্ষ অথচ স্বাধীন মানসিকতা দিয়েছে। নদী তাঁদের রোজগার জুগিয়েছে, কিন্তু বিনিময়ে দিয়েছে প্রকৃতির কঠোরতা সহ্য করার ক্ষমতা। নদীর পরিবেশ তাঁদের গ্রাম্য সরলতা এবং একই সঙ্গে প্রয়োজনে রুখে দাঁড়ানোর শক্তি জুগিয়েছে, যা গল্পের মূল সংঘাতকে আরো তীব্র করে তুলেছে।
প্রশ্ন-৪: সাহস ও অদম্য মনোবল
উদ্দীপক:
পুরোনো জমিদারবাড়ির জরাজীর্ণ এক অংশে দুজন প্রবীণ মহিলা বাস করতেন। একদিন গভীর রাতে একদল লোক চোর সন্দেহে তাঁদের বাড়িতে ঢুকে পড়ে। চোরেরা তাঁদের গয়না ও সামান্য সঞ্চয় লুট করতে চাইলে, বয়স্ক হলেও মহিলারা লাঠিসোঁটা হাতে তীব্র চিৎকার করে প্রতিরোধ গড়েন। তাঁদের এই অদম্য সাহস আর সাহসিকতা দেখে চোরেরা শেষ পর্যন্ত পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়।
(ক) জ্ঞানমূলক: আহ্লাদির বাবার বাড়ির সম্পত্তি কে দেখাশোনা করত?
(খ) অনুধাবনমূলক: লেখক কেন মাসি-পিসিকে ‘দুর্গ’ বলে অভিহিত করেছেন?
(গ) প্রয়োগমূলক: উদ্দীপকের প্রবীণ মহিলাদের সাহসিকতা ‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি-পিসির কোন দিকের সঙ্গে তুলনীয়—ব্যাখ্যা করো।
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক: “বয়স বা শারীরিক শক্তি নয়, মানসিক দৃঢ়তাই পারে শোষকের মোকাবিলা করতে” ‘মাসি-পিসি’ গল্পের আলোকে উক্তিটির যৌক্তিকতা বিচার করো।
উত্তর-৪
(ক) জ্ঞানমূলক:আহ্লাদির বাবার বাড়ির সম্পত্তি জগু ও তার আত্মীয়-স্বজন দেখাশোনা করত।
(খ) অনুধাবনমূলক:লেখক মাসি-পিসিকে ‘দুর্গ’ বলে অভিহিত করেছেন, কারণ তাঁরা ছিলেন দুর্বল ও অসহায় আহ্লাদির জন্য এক অভেদ্য আশ্রয়। দুর্গ যেমন বাইরের আক্রমণ থেকে ভেতরের বাসিন্দাদের রক্ষা করে, তেমনি মাসি ও পিসি নিজেদের সামান্য কুটিরে থেকে গ্রামের প্রভাবশালী শোষকগোষ্ঠীর হাত থেকে আহ্লাদিকে রক্ষা করেন। তাঁদের এই আশ্রয় কেবল ইট-কাঠের ছিল না, ছিল অটুট মানসিক জোর, সাহস ও ভালোবাসার। তাই, তাঁদের অদম্য প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বোঝানোর জন্যই লেখক এই উপমাটি ব্যবহার করেছেন।
(গ) প্রয়োগমূলক:উদ্দীপকের প্রবীণ মহিলাদের সাহসিকতা ‘মাসি-পিসি’ গল্পের মাসি-পিসির অদম্য মনোবল ও প্রতিরোধের দিকের সঙ্গে তুলনীয়।
উদ্দীপকের মহিলারা যেমন দুর্বল ও প্রবীণ হওয়া সত্ত্বেও নিজেদের জীবন ও সম্পদ রক্ষায় শক্তিশালী চোরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, ঠিক তেমনি মাসি-পিসিও শারীরিক দিক থেকে দুর্বল ও দরিদ্র হলেও প্রভাবশালী গোমস্তা ও তার সশস্ত্র অনুচরদের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে তোলেন। উভয় ক্ষেত্রেই শারীরিক শক্তির চেয়ে মানসিক দৃঢ়তা ও সাহসিকতাই প্রধান অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছে, যার ফলে দুর্বৃত্তরা শেষ পর্যন্ত পিছু হটতে বাধ্য হয়।
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক:উক্তিটি ‘মাসি-পিসি’ গল্পের মূল ভাবনার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক এবং এটি সম্পূর্ণ যৌক্তিক।
গল্পের মাসি ও পিসি দুজনেই দরিদ্র, প্রায় অনাহারী এবং বয়সের ভারে ন্যুব্জ। তাঁরা সামান্য মাছ ধরে কোনোমতে দিন গুজরান করেন। সমাজের শক্তিশালী অংশ গোমস্তা ও আহ্লাদির স্বামীর দল যখন সশস্ত্রে আসে আহ্লাদিকে নিয়ে যেতে, তখন মাসি-পিসির একমাত্র শক্তি ছিল তাঁদের মানসিক দৃঢ়তা এবং আহ্লাদির প্রতি তাঁদের ভালোবাসা। এই মানসিক শক্তিই তাঁদের হাতে দা-বঁটি তুলে দেয় এবং তাঁরা মৃত্যুর ভয় না করে রুখে দাঁড়ান।
মাসি-পিসির প্রতিরোধ প্রমাণ করে যে, অন্যায়কে মেনে না নেওয়ার যে মানসিকতা, তা যেকোনো শারীরিক শক্তির চেয়ে বেশি শক্তিশালী। তাঁদের নৈতিক সাহসই শোষকদের দম্ভকে চূর্ণ করে দেয়। গল্পটি এই শিক্ষাই দেয় যে, দুর্বল হয়েও যদি কেউ নীতি ও সাহসের ওপর ভর করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তবে সে অবশ্যই শোষকের মোকাবিলা করতে সক্ষম হয়।
প্রশ্ন-৫: নীরবতা থেকে প্রতিবাদে উত্তরণ
উদ্দীপক:
এক শিক্ষক ক্লাসে আলোচনা করছিলেন যে, সমাজের কোনো অন্যায় তখনই স্থায়ী হয়, যখন দুর্বল পক্ষ নীরব থাকে এবং নিজেদের অধিকারের জন্য প্রশ্ন করতে ভয় পায়। শিক্ষক বলেন, প্রতিবাদ মানে শুধু চিৎকার করা নয়, নীরবতা ভেঙে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সামান্যতম প্রতিরোধ গড়ে তোলাও প্রতিবাদের শামিল।
(ক) জ্ঞানমূলক: মাসি-পিসির মূল পেশা কী ছিল?
(খ) অনুধাবনমূলক: ‘কেমন আছে জানাজানি হতে বাকি নাই’—উক্তিটির তাৎপর্য ব্যাখ্যা করো।
(গ) প্রয়োগমূলক: উদ্দীপকের শিক্ষকের বক্তব্যটি ‘মাসি-পিসি’ গল্পের কোন চরিত্রের নীরবতা ভেঙে প্রতিবাদে উত্তরণের সঙ্গে সম্পর্কিত? ব্যাখ্যা করো।
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক: “মাসি-পিসির প্রতিরোধ শুধু আহ্লাদি-এর জন্য নয়, তা ছিল সমাজের শোষিত সব নারীর পক্ষে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ” বিশ্লেষণ করো।
উত্তর-৫
(ক) জ্ঞানমূলক:মাসি-পিসির মূল পেশা ছিল মাছ ধরে ও শাক-সবজি ফলিয়ে জীবিকা নির্বাহ করা।
(খ) অনুধাবনমূলক:‘কেমন আছে জানাজানি হতে বাকি নাই’—উক্তিটির তাৎপর্য হলো আহ্লাদি তার শ্বশুরবাড়িতে কী পরিমাণ শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে, তা গ্রামের সবাই ভালো করেই জানত। এখানে ‘জানাজানি’ শব্দটি দিয়ে বোঝানো হয়েছে যে, এই নির্যাতন কোনো ব্যক্তিগত বা গোপন বিষয় ছিল না, বরং তা ছিল সমাজের চোখে দেখা একটি সাধারণ চিত্র। সমাজের লোকজনের নীরবতা এই নির্যাতনকে আরো বেশি সহজ করে তুলেছিল। তাই লেখক এই উক্তির মাধ্যমে সমাজের এই বাস্তবতাকে তুলে ধরেছেন।
(গ) প্রয়োগমূলক:উদ্দীপকের শিক্ষকের বক্তব্যটি ‘মাসি-পিসি’ গল্পের আহ্লাদির নীরবতা ভেঙে মাসি-পিসির সক্রিয় প্রতিবাদে উত্তরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আহ্লাদি প্রথমে স্বামীর নির্যাতনে নীরব ছিল এবং মাসি-পিসির কাছে আশ্রয় নিলেও তার দুঃখের কথা সহজে বলতে পারত না। এই নীরবতা শোষককে আরো শক্তিশালী করে। উদ্দীপকের শিক্ষক যেমন বলেছেন, নীরবতা ভেঙে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করাই হলো প্রতিবাদ, তেমনি আহ্লাদির নীরবতা ভেঙে মাসি-পিসির সক্রিয় প্রতিবাদ সেই পথ খুলে দেয়।
মাসি-পিসি আহ্লাদির জন্য কেবল আশ্রয় হননি, বরং তাকে রক্ষা করার জন্য গোমস্তার দলবলের বিরুদ্ধে দা-বঁটি হাতে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের এই প্রতিরোধ আহ্লাদিকে তার অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে এবং তার নীরবতাকে প্রতিবাদের ভাষায় রূপান্তরিত করে।
(ঘ) উচ্চতর দক্ষতামূলক:“মাসি-পিসির প্রতিরোধ শুধু আহ্লাদি-এর জন্য নয়, তা ছিল সমাজের শোষিত সব নারীর পক্ষে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ” উক্তিটি একটি গভীর সামাজিক তাৎপর্য বহন করে।
মাসি-পিসির প্রতিরোধকে কেবল ব্যক্তিগত বা পারিবারিক সংঘাত হিসেবে দেখলে গল্পের মূল বার্তাটি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। আহ্লাদি ছিল তৎকালীন সমাজের শোষিত, অসহায় এবং বিধবা নারীর প্রতীক। তার ওপর নির্যাতন এবং তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা ছিল পুরুষতান্ত্রিক সমাজের শোষণের একটি অংশ। মাসি-পিসির প্রতিরোধ তাই কেবল আহ্লাদিকে রক্ষা করেনি, বরং তা সেই সমাজের সকল নারীকে এই বার্তা দিয়েছিল যে, শোষণকে মেনে না নিয়ে রুখে দাঁড়ানো সম্ভব।
তাঁদের এই কাজ সমাজের প্রভাবশালী গোমস্তা ও পুরুষদের কর্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ জানায়। গল্পের শেষে নদীর ঘাটে অন্য নারীদের এগিয়ে আসা প্রমাণ করে যে, মাসি-পিসির একক সাহস একটি সম্মিলিত প্রতিবাদের জন্ম দিতে সক্ষম হয়েছিল। এটি ছিল নারী সংহতির এমন এক উদাহরণ, যা শোষিত শ্রেণির নারীদের মধ্যে এক নতুন আত্মবিশ্বাস ও চেতনার সঞ্চার ঘটিয়েছিল। এই অর্থে, তাঁদের পদক্ষেপ ছিল সমাজের স্থিতিশীল শোষণ কাঠামোর বিরুদ্ধে একটি যুগান্তকারী প্রতিবাদ।
নোট: HSC পরীক্ষার প্রস্তুতিতে এই গল্পের ‘নারী-সংহতি’ এবং শোষণের বিরুদ্ধে নৈতিক প্রতিরোধ’ এই দুটি মূল থিমকে কখনোই এড়িয়ে যেও না। সৃজনশীল উত্তরে এই দিকগুলো বিশ্লেষণ করতে পারলেই তোমার সাফল্য নিশ্চিত।
