গ্যাস্ট্রিক আলসার বা পেপটিক আলসার হলো পাকস্থলী বা ডিউডেনামের (পাকস্থলীর পরের অংশ) ভেতরে সৃষ্ট এক ধরনের ক্ষত বা ঘা। এটি আমাদের দেশে একটি অত্যন্ত প্রচলিত সমস্যা, বিশেষ করে যারা দীর্ঘদিন অনিয়মিত জীবনযাপন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং মানসিক চাপের মধ্যে থাকেন তাদের মধ্যে এ রোগ বেশি দেখা যায়। অনেক সময় গ্যাসট্রিকের সাধারণ ব্যথাকে আমরা গুরুত্ব দিই না, অথচ সেটিই ধীরে ধীরে আলসারে রূপ নিতে পারে।
এই ব্লগে আমরা বিস্তারিত জানব গ্যাসট্রিক আলসারের কারণ, লক্ষণ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে।
গ্যাস্ট্রিক আলসার কী?
গ্যাসট্রিক আলসার হলো পাকস্থলীর অভ্যন্তরে তৈরি হওয়া ঘা বা ক্ষত। পাকস্থলী স্বাভাবিকভাবে অ্যাসিড উৎপাদন করে খাবার হজম করার জন্য। কিন্তু যখন অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায় কিংবা পাকস্থলীর আস্তরণ দুর্বল হয়ে যায়, তখন অ্যাসিড সেই আস্তরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে আলসার তৈরি করে।
এটি মূলত দুই ধরনের হতে পারে:
- গ্যাস্ট্রিক আলসার – পাকস্থলীতে সৃষ্টি হওয়া আলসার।
- ডিউডেনাল আলসার – ক্ষুদ্রান্ত্রের প্রথম অংশে সৃষ্টি হওয়া আলসার।
গ্যাসট্রিক আলসারের প্রধান কারণ
গ্যাসট্রিক আলসার হওয়ার অনেক কারণ রয়েছে। সঠিক কারণ বুঝে চিকিৎসা করাই এ রোগ নিরাময়ের জন্য জরুরি।
১. হেলিকোব্যাক্টার পাইলোরি (H. pylori) সংক্রমণ
এটি একটি বিশেষ ধরনের ব্যাকটেরিয়া যা পাকস্থলীর আস্তরণে সংক্রমণ ঘটায়। এটি গ্যাসট্রিক আলসারের সবচেয়ে বড় কারণ।
২. ব্যথানাশক ওষুধের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহার
ইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিন বা ন্যাপ্রক্সেনের মতো NSAIDs বেশি দিন খেলে পাকস্থলীর আস্তরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আলসার হয়।
৩. অতিরিক্ত অ্যাসিড উৎপাদন
স্ট্রেস, অনিয়মিত খাওয়া–দাওয়া, মশলাযুক্ত খাবার অতিরিক্ত খাওয়ার কারণে পাকস্থলীতে অ্যাসিডের মাত্রা বেড়ে যায়।
৪. ধূমপান ও মদ্যপান
ধূমপান পাকস্থলীর রক্তসঞ্চালন কমায় এবং আস্তরণ দুর্বল করে দেয়। অন্যদিকে অ্যালকোহল পাকস্থলীর আস্তরণে প্রদাহ সৃষ্টি করে আলসারের ঝুঁকি বাড়ায়।
৫. বংশগত কারণ
যাদের পরিবারে আলসারের ইতিহাস আছে তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
গ্যাস্ট্রিক আলসারের লক্ষণ
গ্যাসট্রিক আলসারের লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ গ্যাস্ট্রিকের মতোই মনে হয়। তবে কিছু বিশেষ লক্ষণ রয়েছে যা লক্ষ্য করলে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখা উচিত।
- পেটে জ্বালা–পোড়া অনুভব – বিশেষ করে খালি পেটে ব্যথা বা জ্বালা বাড়ে।
- খাওয়ার পর ব্যথা কমে যাওয়া – তবে কিছুক্ষণের মধ্যে আবার ফিরে আসে।
- অতিরিক্ত ঢেঁকুর তোলা ও বমি বমি ভাব
- পেটে ফাঁপা ভাব
- খাবারে অনীহা
- ওজন কমে যাওয়া
- রক্তবমি বা কালো পায়খানা – এটি গুরুতর অবস্থার লক্ষণ।
গ্যাসট্রিক আলসারের জটিলতা
চিকিৎসা না করলে গ্যাসট্রিক আলসার থেকে গুরুতর জটিলতা তৈরি হতে পারে। যেমন:
- পাকস্থলী বা অন্ত্রে রক্তক্ষরণ
- পাকস্থলীর ভেতরে ছিদ্র (Perforation)
- খাবারের পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়া
- দীর্ঘমেয়াদি আলসার থেকে পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বৃদ্ধি
গ্যাসট্রিক আলসার নির্ণয়ের উপায়
গ্যাসট্রিক আলসার নির্ণয়ের জন্য সাধারণত কিছু পরীক্ষা করা হয়:
- এন্ডোস্কপি – ক্যামেরাযুক্ত টিউবের মাধ্যমে পাকস্থলীর ভেতর দেখা হয়।
- ইউরিয়া ব্রেথ টেস্ট – H. pylori সংক্রমণ শনাক্ত করতে করা হয়।
- স্টুল টেস্ট – মলের মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি জানা যায়।
- ব্লাড টেস্ট – H. pylori সংক্রমণ আছে কি না তা বোঝার জন্য।
গ্যাস্ট্রিক আলসারের চিকিৎসা
গ্যাসট্রিক আলসারের চিকিৎসা নির্ভর করে এর কারণ ও অবস্থার ওপর।
১. ওষুধ
- অ্যান্টিবায়োটিক – H. pylori সংক্রমণ দূর করতে।
- প্রোটন পাম্প ইনহিবিটার (PPI) – পাকস্থলীর অ্যাসিড কমাতে।
- H2 ব্লকার – অ্যাসিড উৎপাদন কমানোর জন্য।
- অ্যান্টাসিড – তাৎক্ষণিক আরামের জন্য।
২. জীবনযাত্রার পরিবর্তন
- মশলাযুক্ত ও তৈলাক্ত খাবার এড়িয়ে চলা।
- নিয়মিত সময় মেনে খাবার খাওয়া।
- ধূমপান ও মদ্যপান পরিহার করা।
- মানসিক চাপ কমানো।
৩. সার্জারি
যদি আলসার জটিল আকার ধারণ করে (যেমন ছিদ্র হয়ে যাওয়া বা রক্তক্ষরণ), তবে সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে।
গ্যাসট্রিক আলসার প্রতিরোধে করণীয়
- পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন খাবার খাওয়া।
- দীর্ঘদিন ব্যথানাশক ওষুধ সেবন এড়িয়ে চলা।
- পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম নেয়া।
- নিয়মিত ব্যায়াম করা।
- ধূমপান ও অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকা।
- খাওয়ার সময় অতিরিক্ত ঝাল, তেল, ভাজা খাবার এড়িয়ে চলা।
কখন ডাক্তার দেখাবেন?
গ্যাসট্রিকের সাধারণ সমস্যা অনেক সময় বাড়িতে নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও কিছু অবস্থায় দ্রুত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া জরুরি। যেমন:
- নিয়মিত পেটে জ্বালা ও ব্যথা
- খাবারের প্রতি অনীহা
- হঠাৎ ওজন কমে যাওয়া
- রক্তবমি বা কালো পায়খানা
- ওষুধ খাওয়ার পরও উপসর্গ না কমা
এক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ঢাকার গ্যাস্ট্রোলিভার বিশেষজ্ঞ ডাক্তারর এর পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
উপসংহার
গ্যাসট্রিক আলসার একটি গুরুতর রোগ হলেও সময়মতো সঠিক চিকিৎসা করলে এটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। অনেক সময় মানুষ গ্যাসট্রিককে সাধারণ বিষয় ভেবে অবহেলা করেন, কিন্তু এটি দীর্ঘস্থায়ী হলে আলসার এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, সঠিক খাবার গ্রহণ এবং প্রয়োজনে দ্রুত বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়াই সুস্থ জীবনের জন্য জরুরি।
