কুকুরের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিৎ?

কুকুরের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিৎ
Written by IQRA Bari

কুকুরের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিৎ? আপনি কি জানেন এই পৃথিবীর সকল প্রাণীই মানুষের ভালোবাসা পেতে চায় এবং মানুষেকে ভালোবাসতে চায়। এই শিক্ষনীয় গল্পটি আপনার জন্যই।

পৃথিবীকে সু-সজ্জিত করতে প্রাণীজগতের বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। প্রতিটি প্রাণীই পৃথিবীর জন্য স্রষ্টা প্রদত্ত রহমত। প্রাণী সম্পদ দেশ ও জাতির জন্য অকল্যাণকর কিছু নয়; বরং শতভাগ কল্যাণের উৎস বলা যেতে পারে।

স্রষ্টার সৃষ্টজগতের একটি গুঁইসাপও মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত। পৃথিবীতে যত প্রাণীর সমাগম দেখা যায় সবই মঙ্গলের পথ ধরেই আবির্ভূত।

মানুষও এক শ্রেণীর প্রাণী। কিন্তু অন্যান্য প্রাণীদের তুলনায় মানুষ উচ্চ শ্রেণীর বটে। বিবেক বুদ্ধি দিয়ে মানুষের মস্তিস্ক তৈরি। মানুষ ব্যতীত প্রাণীজগতের কোন প্রাণীই বিবেক বুদ্ধিতে দৃশ্যমান নয়।

এজন্যই মানুষ প্রাণীকূলের মাঝে শ্রেষ্ঠ। স্রষ্টা প্রদত্ত পৃথিবীতে যত প্রাণ পাওয়া যায় সব প্রাণের শ্রেষ্ঠত্ব মানুষ নামক প্রাণীর অস্তিত্বে দেওয়া হয়েছে। তাই মানুষকে শ্রেষ্ঠজীব বা মাখলুকাতের সেরা হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। প্রাণীকূলের শ্রেষ্ঠ হিসেবে সকল প্রাণীদের প্রতি ভালোবাসা রাখা আমাদের নৈতিক ও মানবিক দায়িত্ব।

আমার জীবনের প্রতিটি মূহুর্তকে আমি প্রাণীদের ভালোবাসায় নিয়োজিত রাখতে চেষ্টা করি।

ছোটবেলা থেকেই প্রাণীদের ভালোবাসা দিয়ে আমার হৃদয় পূর্ণ ছিল। তখন আমার বয়স দশ- বারো বছর হবে। মাদ্রাসায় হিফজ বিভাগে পড়ি। আমি মাদ্রাসায় থেকে পড়তাম, বাড়িতে তেমন যাওয়া হতো না।

আমার খাবার বাড়ি থেকেই নিতে হতো। অনেক সময় আমার দাদা ও ছোট ভাইয়ের মাধ্যমে খাবার পাঠানো হতো, আবার অনেক সময় সহপাঠিদের নিয়ে আমি নিজেই বাড়িতে এসে খাবার নিয়ে যেতাম।

সাপ্তাহিক (শুক্রবার) মাদ্রাসা ছুটি হতো, তখন বাড়িতে আসতাম। শুক্রবারের সারাদিন পাড়ার ছেলে-মেয়েদের সাথে খেলা করতাম। কোন একদিন মাঠে খেলতে গিয়ে মাঠের এক পার্শে একটি কুকুরছানার কান্না শুনতে পেলাম।

তখন কুকুরছানাটিতে দেখতে গেলাম। হঠাৎ কুকুরছানাকে দেখে একটু ভয় পেয়েই গিয়েছিলাম। সারা শরীরে কাঁদা মাখা। মনে হলো কুকুরছানাটির খুব কষ্ট হচ্ছে।

তাছাড়া তখন ছিল শীতকাল। শিশির ভেজা ঘাসের উপর বাতাসের ঝাপটায় বেশ কাঁপতে দেখেছি। আশেপাশে তার সঙ্গি নেই । মায়ের আদর থেকে সে বঞ্চিত।

হয়তো মাকে হারিয়ে ফেলে সে কাঁদা মাটিতে গড়াগড়ি করতে ছিল। আমি এদিক ওদিক তাকালাম, কোথাও তার মাকে দেখতে পেলাম না। পাশের বন্ধুুরা আমায় রেখে চলে যাচ্ছে।

কুকুরছানাটি আমার দিকে অসহায় মজলুমের মতো চেয়ে আছে। হৃদয়ে একটু মায়া জাগলো। আমি তখন মনে মনে ভাবলাম এই কুকুরছানাটিকে আমি বাড়িতে নিয়ে যাব।

শীতের বিকেলে কাঁদামাখা দেহে হাত লাগানোর মন মানসিকতা যেন একটুও নেই; তবুও নিজেকে শ্রেষ্ঠজাতি মনে করে কুকুরছানাটিকে দুহাতে ধরে বাড়িতে নিয়ে এলাম।

সহযোগি হলো আমার স্নেহের ছোট ভাই। আমাকে বিভিন্নভাবে সে সহযোগিতা করতে লাগলো। দুইভাই মিলে একটি কাপড় দিয়ে কুকুরছানার শরীর মুছে দিলাম।

দুইভাই মিলে পরামর্শ করতে লাগলাম এখন কুকুরছানাটিকে কোথায় রাখব? পরিবারের গুরুজনদের ভয়ে পাশের রান্না ঘরের এক কর্ণারে ছোট্ট পরিসরে একটি জায়গা করে নিলাম। সেখানেই রাখলাম।

এভাবে সঁন্ধ্যা নেমে গেল। ওদিকে একটু আঁড়াল হতেই কুকুরছানাটি কান্না করতে লাগলো। আম্মু হয়তো শুনে ফেলবে; ভয়ে দুইভাই আতঙ্কে আছি!

হঠাৎ আম্মুকে চাচি মা ডেকে ঘর থেকে বাহিরে নিয়ে গেলো। তৎক্ষণাত দুইভাই আনন্দে মেতে উঠেছি। যাক, বাঁচা গেল! সময়ের কাটা এশার পানে ছুটলো।

ওদিকে কুকুরছানার হাউমাউ কান্না বাড়তে লাগল। কিছুক্ষণ পর পরিবারের সবাই একসাথে টেবিলে খেতে বসলাম। খেতে খেতে মাংসের অনেক হাড় ও মাছের কাঁটা জমা করলাম।

বড় বড় হাড় ও কাঁটাগুলোকে ছিবিয়ে কুকুরছানার খাওয়ার উপযোগি করে তুললাম। মাংসের কিছু টুকরাকে টেবিলের নিচে ফেলে দিলাম সবার অজান্তেই। হঠাৎ করে একটি মাংসের টুকরা ছোটভাইয়ের পায়ে পড়ে গেল! সে হাঁকিয়ে উঠলো, চোখের ইশারাতে বললাম কিছু বলিস না।

এদিকে দুইভাইয়ের হাসি যেন থামছে না। খাওয়া দাওয়া শেষ হলো। মা গুছানোর কাজ করছে। মাকে আড়াল করেই দুইভাই মিলে সবগুলো মাংস কুড়িয়ে নিলাম। টেবিলে রাখা উৎছিষ্ট  খাবারের অংশ ও হাড় এবং কাঁটাগুলো জমা করলাম।

ছোটভাই পাহারার কাজে ব্যস্ত। সে আম্মুকে দেখছে। আমি সুযোগ পেলাম! সুযোগে কুকুরছানার খাবার ঘুচিয়ে নিলাম। গুছানোর কাজ শেষ করে আম্মু অন্যকাজে ব্যস্ত।

এই সময়ে কুকুরছানাকে খাবার খাইয়ে দিলাম। এবার তো কুকুরছানার হাউমাউ কান্না নেই, তবে পিছু ছাড়ছে না কিছুতেই। যদিও আঁড়াল হতে চাই তবুও পারছিলাম না আঁড়াল হতে। তবুও যেন আঁড়াল হতেই হবে।

বিছানায় শোয়ে শোয়ে কুকুরছানাকে নিয়ে দুইভাই বিশেষ কিছু প্লান করলাম। এভাবে অনেক কষ্ট উপেক্ষা করে রাত কাটলো।

সুবহে সাদিক হওয়ার আগেই দুইভাইয়ের ঘুম ভেঙে গেল। ভোরের আলোর অপেক্ষায় প্রহর গুনছি…। ফজরের আজান হলো, নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে প্রাণখোলে দোয়া করলাম কুকুরছানার জন্য।

নামাজ শেষে রান্নাঘরে গেলাম, মায়ের অজান্তেই পাতিল থেকে কিছু মাংস কুকুরছানাকে দিলাম। পেটভরে খেল। কিছুক্ষণ পর কুকুরছানার হাউমাউ কান্না সবাই শুনে ফেলল। পরিবার থেকে দুইভাই অনেক বকা শুনলাম!

কুকুরছানাকে একরাত বাড়িতে রাখতে পেরে পাহাড়ের মত উঁচু স্বপ্নগুলো এখন আকাশ ছুঁতে চায়!! ওদিকে মাদ্রাসায় চলে যাওয়ার সময় হলে গেল। কি করবো ভেবে পাচ্ছি না। দুইদিন পর মাদ্রাসা কোরবানি ঈদ উপলক্ষে ১২ দিনের জন্য বন্ধ হবে।

কিন্তু মাঝখানের দুইদিন কিভাবে কাটবে সেটা নিয়েই টেনশনে ছিলাম। কিছু করার নেই। ছোট ভাইকে দায়িত্ব দিলাম, যেভাবেই হোক লুকিয়ে-গুছিয়ে হলেও দুইদিনের ব্র্যাকআপ তোকেই নিতে হবে। আমি চলে গেলাম মাদ্রাসায়।

দুপুরের খাবারের সময় হতেই একা একা ছুটে এলাম বাড়িতে। আমায় দেখে সবাই অবাক! অনেক প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছি। তবুও স্বপ্ন যে একটি কুকুরছানাকে লালন করা। সন্ধ্যায় আবার ছুটে গেলাম মাদ্রসায়, ওদিকে ছোটভাই ভালোই যত্ন নিচ্ছে কুকুরছানার।

পরদিন মাদ্রাসা বন্ধ ঘোষণা হলো। আনন্দে সবার আগেই ছুটে এলাম বাড়িতে। এতটাই আত্মভোলা হয়ে বাড়িতে এসেছি, কোন জামা-কাপড়, টিফিন বাটি ইত্যাদি কিছুই নিয়ে আসতে মনে নেই। বাড়িতে আসতেই আবরো নেমে এল বিপদের শঙ্কা। কোন মতে ম্যানেজ হলো।

ছুটির এইদিনগুলোতে কুকুরছানাকে এতটাই ভক্ত বানিয়ে নিলাম যে, সে এখন আর একা থাকতে চায় না। যেখানেই যাই সে পিছু ছুটে। কুকুরছানার জন্য আলাদা একটা ঘর তৈরি করলাম। মাঝে মাঝে অন্যান্য কুকুরছানার সাথে তাকে ফাইট লাগাতাম। যেন বড় হলে সেও একটা শক্তিধর হয়।

কেননা, এই কুকুরছানাটি ছোটবেলায় অনেক অবহেলিত ছিল। অনেক কৌশলে কুকুরছানাটিকে বক্সিন ফাইটারের মতো পালোয়ান গড়ে তুললাম! এভাবেই বন্ধের দিনগুলোর ইতি ঘটে।

আবারো কুকুরছানার পুরো দায়িত্বটা ছোট ভাইয়ের উপর। তারও স্কুল আছে। তবুও কুকুরছানাকে কখনও কষ্ট দেয়নি। বেশি করে খাবার কুকুরছানার জন্য বাটিতে রেখে দেয়। যখনই ইচ্ছে কুকুরছানা আহার করে। আমিও নিয়মিত মাদ্রাসা থেকে এসে দেখে যাই। এভাবেই বড় হতে লাগল কুকুরছানাটি।

এভাবেই গত হয়ে গেল একটি বছর…

এখন আর কুকুরছানা নয়; মাংসপেশিতে অনেক বড়। দেখতেও খুব ভয়ঙ্কর লাগে। শক্তিতে প্রায় ২ /৩ টা সাধারণ নেড়ি কুকুরের সমান। তবে হাজার কুকুরের মাঝে এই কুকুরটি ভিন্ন। যেমন দাপট তেমনই ভদ্র। নামটা বলতে ভুলেই গিয়েছি। কুকুরছানাটিকে ’টাইগার’ বলে ডাকতাম।

ভাগ্যের কি পরিবর্তন, এখন সে সত্যিই ’টাইগারের’ মতই প্রায়! এবার যুদ্ধে পাঠানোর পালা!! তবে টাইগার তো বিনাদোষে কোন কুকুরের সাথে ফাইট করে না। টাইগারকে যতই দেখছিলাম ততই মুগ্ধ হচ্ছিলাম।

একটি পশুর মাঝেও এত গুণ আছে, যা আমার জানা ছিল না। আমি একদিন ছোট ভাইদের নিয়ে পুকুরে সাঁতার কাটতে লাগলাম, হঠাৎ দেখি টাইগার আমার পাশে সাঁতার কাটছে! আমি সেদিন এতটাই অবাক হয়েছিলাম যে, বুঝানো অতি দুর্লভ।

সবচেয়ে মজার বিষয় হলো আমাদের পুকুর ৫০ শতাংশ জমিজুড়ে, তবুও টাইগার কার ভরসায় এত বিশাল পুকুর পাড়ি দিতে সাঁতার দিলো! তখন থেকেই টাইগারের প্রতি অধিক ভালোবাসা জন্মাতে লাগল।

আমি যখন মাদ্রাসায় যেতাম, টাইগার পিছুপিছু মাদ্রাসা পর্যন্ত যেত।
এভাবে মনের আঙিনায় জায়গা করে অনেক ভালোবাসার পাত্র হয়েছিল টাইগার। হঠাৎ একদিন ছাগলের নবজাতক ছানাকে টাইগার কামড় দিয়েছে বলে অভিযোগ পেলাম।

তারপর দড়ি দিয়ে টাইগারকে বাঁধলাম এবং অনেক বেশি প্রহার করেছিলাম, যা কল্পনার বাইরে ছিল। আমি ভাবলাম ’টাইগার’ আর হয়ত আমার কাছে আসবে না কখনই। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলাম টাইগার আমার পাশে। ডাক দিলাম, তৎক্ষণাত আমার সামনে এলো।

টাইগারের চোখ থেকে অভিমানের কান্না গড়িয়ে পড়ছে। আমিও আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না, আমিও টাইগারের গায়ে হাত বুলিয়ে কাঁদতে লাগলাম। অথচ, এই পবিত্র গুনটি একজন বিবেকবান মানুষের মাঝে পাওয়া দুষ্কর ব্যাপার যা টাইগারের মাঝে বিদ্যমান।

প্রাণীর প্রতি ভালোবাসা তখনই আমার হৃদয়কে পূর্ণ করেছে। আমি আল্লাহর সকাকে ক্ষমা প্রার্থনা করতে লাগলাম। কিছুক্ষণ পর জানতে পেলাম ছাগল ছানাকে টাইগার কামড় দেয়নি। অন্য একটা নেড়ি কুকুর কামড় দিয়েছে।

একথা শুনে নিজের প্রতি একটা ঘৃণ্য ভাব চলে এলো। আহ্! কি করলাম!! টাইগারের প্রতি একিবারে বিনয়ী আচরণের সহিত ভালোবাসা ও নিজের ব্যর্থতা প্রকাশ করতে দ্বিধা করিনি।

আমি বুঝতে পারলাম টাইগারও আমার ব্যর্থতাকে হাসি মুখে গ্রহণ করেছে। টাইগার এখন আরো কাছের বন্ধু! মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে যতদিন এসেছি টাইগারকেই প্রথম খোঁজ করেছি। এভাবে অনেকদিন পার হলো।

আমাদের বাড়িতে একজন রাখাল ছিল, সে হঠাৎ একদিন আমার মাদ্রাসায় খবর নিয়ে গেল যে টাইগার রাস্তায় একটি বোঝাই ট্রাকের নিচে ছাপা পড়ে মারা গেছে!

আমার চোখের অশ্রুতে বুক ভিজে গেলো। মাদ্রাসার ক্লাস ছুটির পর বাড়িতে আসার আগেই বন্ধু টাইগারকে বাড়ির সবাই সমাহিত করে ফেলে!

একটি কুকুরের জন্যে তখন থেকেই আমি প্রাণীদের মাঝে নিজের ভালোবাসাকে ছড়িতে দিতে চাই। আমি চাই সৃষ্টজগতে প্রতিটি প্রাণীই স্বাধীন হয়ে চলুক।

মানুষ যেন কখনই প্রাণীকূলের ক্ষতি সাধন না করে। মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব কোমল আচরণেই প্রকাশ পায়। প্রাণীদের প্রতিও সুনির্মল আরচণ দেখাতে হবে। এটাই মানুষের শ্রেষ্ঠত্বের পরিমাপ।

গল্প থেকে শিক্ষাঃ

কুকুরের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা অনেক পুরোনো। আদিম যুগে মানুষ তার গৃহ পাহারা ও শিকারের কাজে কুকুর পালন করতো।

তখন থেকেই কুকুরের প্রতি মানুষের ভালোবাসার জন্ম হয়।

তাছাড়া, কুকুর এমন একটি প্রাণী যা মানুষেই কাছাকাছি থাকতে পছন্দ করে।

আপনার সামনে যদি কখনো কোন প্রাণীকে কষ্ট করতে দেখেন তবে আপনি তার হয়ে যান! প্রাণীকে সেবা করুন।

মহান আল্লাহ আপনাকে তার প্রতিদান দেবেন ইনশাআল্লাহ।

About the author

IQRA Bari

আলোর অনুপস্থিতিতেই অন্ধকারের জন্ম। অথচ, অন্ধকারের কোন অস্তিত্ব নেই।
আমরা যদি আলোকিত হই, তবে সমাজে অন্ধকার বলতে কিছুই থাকবে না।

Leave a Comment